সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০২০, ১২:৩২ অপরাহ্ন

পথে পথে বিক্ষোভ, এত ত্রাণ গেলো কই?

ত্রাণের দাবীতে বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভ

এন আই সব্যসাচী: নিজের নির্বাচনী এলাকা ফতুল্লার ৫টি ইউনিয়নের ৪৫টি ওয়ার্ডে রাতে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান। ১৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে নারায়ণগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত ডিসি সেলিম রেজা বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে ১ লাখ ৩০ হাজার পরিবারের মধ্যে আমরা ত্রাণ পৌঁছে দিতে পেরেছি। এ ছাড়াও আমাদের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, শিল্পপতিরাও ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয়ভাবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতারা প্রতিদিন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন। কিন্তু তারপরেও নারায়ণগঞ্জে বাড়ছে অনাহারীর সংখ্যা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নারায়ণগঞ্জ ত্যাগ করার চেষ্টা করেছিলেন শত শত মানুষ। তাদের সকলের একটি অভিযোগই ছিল ঠিকমতো আহার জুটছে না। পেটের তাড়নাতেই কোনোমতে গাড়ি ভাড়া জোগাড় করে নারায়ণগঞ্জ ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। বিশেষ করে বিপাকে পড়েছেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা, যাদের গার্মেন্ট খোলা হবে জানিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে আনা হয়েছে। তাদের অনেকে চলতি মাসের বেতন পাননি।

৮ এপ্রিল ফতুল্লা ইউনিয়নের ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রথমে ফতুল্লা মডেল থানার সামনে অবস্থান নেয়। পরে বিক্ষোভ-মিছিল নিয়ে ফতুল্লা চৌধুরী বাড়িস্থ ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপনের বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।

একইদিন কাশীপুর এলাকায় খাদ্যসামগ্রী না পেয়ে খাদ্য সংকটে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন নিম্নআয়ের বর্তমানে কর্মহীম মানুষরা।

১২ এপ্রিল কুতুবপুর ইউনিয়নে  শতাধিক পরিবার খাদ্য সামগ্রী না পেয়ে ত্রাণের দাবীতে রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ করে  নিন্ম আয়ের শতাধিক পরিবারের শত-শত নারী পুরুষ।শত শত নারী পুরুষ ত্রানের দাবীতে একত্রিত হয়ে রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে অবস্থান গ্রহন করে।

১৮ এপ্রিল ত্রাণের দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনের সড়ক অবরোধ করে  বিক্ষোভ করেছেন অসহায় দরিদ্র শতাধিক মানুষ।

২৯ এপ্রিল ত্রাণের দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা।এ সময় ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আটকা পড়ে জরুরি কাজে বের হওয়া পরিবহনগুলো।

১ মে ত্রাণের দাবিতে আবারও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে পরিবহন শ্রমিকরা। এবার তারা বিক্ষোভ করেছে  সিদ্ধিরগঞ্জের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল মোড়ে।সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে টহলে থাকা সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের ত্রাণ দেয়ার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এদিকে কয়েকদিনে ফতুল্লা এলাকার অনেক মানুষের অভিযোগ ছিল তারা ত্রাণ বা খাদ্যসামগ্রী পাননি। একই অভিযোগ শহর বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকার ভূক্তভোগীদের। নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন জায়গায় নিম্ন আয়ের মানুষ, অনাহারী ও কর্মহীন শ্রমিকদের পথে পথে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠছে এত ত্রাণ গেলো কই?
হরিহরপাড়া এলাকার রাসেল ও রিপন জানান, তাদের কলোনিতে অন্তত ৫০টি পরিবার বসবাস করে। গত ১৫ দিন ধরে তাদের ঘরে খাবার নাই। ফলে তাদের খুব কষ্ট করতে হচ্ছে। অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটাতে হচ্ছে। স্থানীয় কেউ খাবার দিচ্ছে তা দিয়ে দিন পার হচ্ছে।

ফতুল্লা পোস্ট অফিস রোড এলাকার আবদুর রহিম জানান, তার বাড়ির পাশে ৩০ জন নিম্নবিত্ত কোনো ধরনের ত্রাণ পাননি। এ ছাড়া সম্প্রতি বন্দরের কয়েকটি ওয়ার্ডেও টানা কয়েক দিন ত্রাণের জন্য বিক্ষোভ হয়েছে। কাশীপুর ইউনিয়নের দু’টি ওয়ার্ডেও বিক্ষোভ হয়েছে।
অপর দিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছে ত্রাণের জন্য। জীবন বাঁচাতে এ জেলা থেকে চলে যাচ্ছেন জীবিকার তাগিদে ছুটে আসা অভাবী মানুষরা। তাদের অভিযোগ, করোনার এ দুর্যোগ মুহূর্তে গত ২৫ মার্চ থেকে লকডাউনের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়ে খরচের বোঝা আর টানতে পারছেন না। সে কারণেই বাধ্যই পেটের তাগিদে নারায়ণগঞ্জ ছাড়তে হচ্ছে তাদের। গত দুই দিনে নারায়ণগঞ্জ ত্যাগের সময়ে অন্তত ৭০০ মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। তবে এর ফাঁকেও অনেকে নারায়ণগঞ্জ ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন আটক ওই সব লোকজন।
তাদের কয়েকজন জানান, তারা মূলত দিনমজুর। বাড়ি জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ এলাকাতে। বেশির ভাগ আলীগঞ্জ পাগলা এলাকাতে লোড-আনলোড, রিকশাচালক, অটোরিকশা চালক, দিনমজুর, রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। কিন্তু ২৫ মার্চ থেকে লকডাউনের কারণে তাদের দিন চলছে না। যেসব বাসায় থাকতেন তার ভাড়া দিতে পারছেন না। সরকারি ত্রাণ মিলছে না তাদের। ঠিকমতো খাবার জুটছে না বিধায় নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দেশের অন্যান্য জেলায়ও করোনা সংক্রমনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন জানান, গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জ ত্যাগের সময় আটককৃতদের বুঝিয়ে শুনিয়ে বাসায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। ওই সময়ে একজন নারী বলেন, কয়েক দিন ধরে বাসায় খাবার নাই। ঘরভাড়া দিতে পারতাছি না। কোনো কাজ নাই। ঠিকমতো খাইতে পারতাছি না। পেট তো চালাইতে হইব। মাইয়াডার চেহারাটা একটু দেখেন স্যার। গর্ভবতী কিন্তু খাওয়াতে পারছি না। আমরা কি সাধে যাইতাছি? এখানে থাকলে আমরা না খাইয়া মইরা যামু। স্যার, আপনি কি আমাদের না খাইয়া মরতে কন?
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান জানান, একটানা লকডাউনের কারণে শুধু দিনমজুর বা হতদরিদ্ররাই নন, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও খাদ্যসঙ্কটে ভুগছেন। তারা না পারছেন কাউকে বলতে না পারছেন চাইতে। আমার কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতে ফতুল্লা থানার ৫টি ইউনিয়নের ৪৫টি ওয়ার্ডে মানুষের রজায়রজায় গিয়ে এই উপহার দিয়ে এসেছেন। একটি মানুষও যাতে না খেয়ে থাকে আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই ব্যবস্থা করছি।

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মতামত লিখুন........


© All rights reserved © 2018 Alokitonarayanganj24.net
Design & Developed by M Host BD
error: দুঃখিত রাইট ক্লিক গ্রহনযোগ্য নয় !!!