বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ০৯:০৬ অপরাহ্ন

কিশোরকে অপহরন করে রাতভর নির্যাতন, চিকিৎসাধীন অব্স্থায় মৃত্যু

আলোকিত নারায়ণগঞ্জ:অপহরণের শিকার এক কিশোর শ্রমিককে রাতভর নির্যাতন করা হয়েছে। রোববার ভোরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অব্স্থায় সুব্রত চন্দ্র মণ্ডল (১৮) নামে ওই কিশোর মারা গেছে।

মৃত্যুর আগে হাসপাতালের বেডে শুয়ে পৈশাচিক নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে সুব্রত।

ভিডিওতে দেখা গেছে, সুব্রতর বুকের ওপর ছোপ ছোপ দাগ, চোখ জখম, সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। বেধড়ক পিটুনিতে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। বাঁ হাতের কব্জির দুটো আঙুলই কাটা, বাকিগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। নির্যাতনে দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে যায় তার।

গত ১৫ মে শহরের দেওভোগ জিউশ পুকুরপাড় এলাকার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে চালানো হয় রাতভর নির্যাতন। পরে মৃত ভেবে সুব্রতকে তার বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়।

ঘটনার আট দিন পর হোসিয়ারী শ্রমিক সুব্রত মণ্ডলকে সাইনবোর্ড এলাকায় প্রো-অ্যাক্টিভ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার ভোরে মারা যায় সে।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী কাউন্সিলর প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনিরের পক্ষে কাজ না করায় সুব্রতকে এভাবেই হত্যা করা হয়েছে।

নিহতের ছোটভাই সঞ্জয় মণ্ডল জানান, সুব্রত নারায়ণগঞ্জে একটি হোসিয়ারীতে কাজ করত। রাতে বাড়ি ফেরার পর এলাকার মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান সায়েম ওরফে ইয়াবা সায়েম ফোন করে তাকে বাসার বাইরে আসতে বলে। বাসা থেকেই বের হতেই মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মোটরসাকেলে করে তাকে তুলে নিয়ে যায়। রাতভর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া যায়নি সুব্রতকে। পরে ভোরে তাকে বাড়ির গেটের সামনে ফেলে রেখে যায় কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসীরা।

সুব্রতকে অপহরণ ও নির্যাতনের বিষয়ে রোববার জিউস পুকুরপাড় এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, সুব্রতকে তুলে নিয়ে প্রথমে জিউস পুকুরের পশ্চিমপাড়ের ঘাটে এলোপাতাড়ি লাথি, ঘুসি ও লাঠি দিয়ে পেটায় সন্ত্রাসীরা। পরে পশ্চিম দেওভোগ ইউসুফ মিয়ার বাড়ির সামনে রাস্তায় ফেলে ইয়াবা সায়েম, সাজিদ, নাঈমুদ্দিন, সাজু, দোলন, রাকেশ, আল আমিন, শুভ, শুভ (২), নিরব, প্রণয়, নোমান শিকদার, অন্তু সাহা ও প্রিতমসহ প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন তার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালায়।

এ সময় বাঁচার জন্য সুব্রত চিৎকার করে আর্তনাদ করছিল। তবে এতে সন্ত্রাসীদের মন গলেনি। পরে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাকে কোপায় সন্ত্রাসীরা। সুব্রত যতবার প্রাণভিক্ষা চায়, ততবারই সন্ত্রাসীরা নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দেয়।

তারা সুব্রতের দুটি আঙুল কেটে নেয়। পায়ে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কোপ দিয়ে বড় ধরনের জখম করে। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীদের নির্যাতনের মাত্রা সইতে না পেরে জ্ঞান হারালে সুব্রতকে মৃত ভেবে তাদের ভাড়া বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যায় সন্ত্রাসীরা।

পরে তাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা (ভিক্টোরিয়া) জেনারেল হাসাপাতালে নিয়ে যায় তার পরিবার। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে সিট ফাঁকা না থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রো-অ্যাক্টিভ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সুব্রতর মাসি লতা মণ্ডল জানান, ডাক্তার বলেছিল সন্ত্রাসীদের মারধরের কারণে তার দুটি কিডনিই ড্যামেজ হয়ে গেছে। এ রোগী বাঁচানো আনেক কঠিন। ডাক্তারের কথাই সত্য হলো।

নিহতের পরিবার জানায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে নগরীর ১৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও সাবেক কাউন্সিলর সফিউদ্দিন প্রধানের হয়ে কাজ করেছিল সুব্রত। সেই সময় একই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনিরের কর্মীরা তাদের প্রার্থীর হয়ে কাজ করতে চাপ দেয় তাকে।

এতে রাজি না হওয়ায় বেশ কয়েকবার তাদের সঙ্গে সুব্রতর বাগবিতণ্ডা হয়। নির্বাচনের দিন ১৬ জানুয়ারি ফল প্রকাশের পর সন্ধ্যায় বিজয়ী কাউন্সিলর মনিরুজ্জামানের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে সুব্রতর হাতাহাতি হয়।

সুব্রতর মা গৌরী রানী মণ্ডল বলেন, আমার সন্তান কী অপরাধ করেছিল? তাকে এভাবে কেন খুন করা হলো? আমি কিছুই চাই না, শুধু সুষ্ঠু বিচার চাই।

এ বিষয়ে ১৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মনিরের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। তার মালিকানাধীন হোটেল ও বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পরিদর্শক আনিচুর রহমান মোল্লা বলেন, এ ঘটনায় নিহতের বোন বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। আসামি যেই হোক, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, সুব্রত বেঁচে থাকাকালীন সে নিজেই কিছু আসামিকে চিহ্নিত করে গেছে। তার একটি ভিডিও আমরা পেয়েছি। আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মতামত লিখুন........


© All rights reserved © 2018 Alokitonarayanganj24.net
Design & Developed by M Host BD
error: দুঃখিত রাইট ক্লিক গ্রহনযোগ্য নয় !!!