মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০৮:৪৬ অপরাহ্ন

নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী রাজনীতিতে কি পরিবর্তন আসছে?

মো. মনির হোসেন: বড় ধরনের অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ছাড়াই শেষ হলো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বহুল আলোচিত নির্বাচন। নির্বাচন এবং ভোটের ফলাফলে কোন পথে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষন। কারণ এই নির্বাচন ঘিরে আওয়ামীলীগের স্থানীয় রাজনীতির বিভাজন প্রকাশ্যে উঁকি দিয়েছে। যা নিরসন করতে পারেনি কেন্দ্রীয় নেতারাও। তাদের ক্ষোভ ফলাফল অনুকুলে আশার পরও দেখা গেছে। নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের পক্ষে গেলেও জেলা ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগ এবং মহানগর শ্রমিকলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। এতে আপাতত বুঝা যাচ্ছে নির্বাচনে অসহযোগিতা অথবা মাঠে না থাকায় এই তালিকায় আরও কোন কোন কমিটি বা নেতা যুক্ত হতে পারেন। কারণ ভোটের আগে মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত এবং বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়েও বিভেদ ভুলে সকল নেতাকর্মীকে মাঠে নামাতে পারেননি কেন্দ্রীয় নেতারা। ফলে দলীয় প্রার্থী ভোটে পাশ করলেও একটা ‘কস্ট’ নিয়ে তারা ফিরে গেছেন। যেই কস্ট দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে আলোচনায় হয়তো স্থান পাবে। এমনটা বলাবলি হচ্ছে আওয়ামী শিবিরে।

তবে, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। নাসিক নির্বাচন তথা নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের বিবদমান গ্রুপিং, লবিং আর নিজ দলে একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগারের কারণে খোদ আওয়ামীলীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্যক্ত বিরক্ত। একাধিকবার দুই পক্ষকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সমঝোতার পরও এদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি না হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হওয়ায়, দলের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নেতিবাচক ও উন্নয়নবিমুখ রাজনীতির চরম ভরাডুবি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ষড়যন্ত্র এবং অপপ্রচারের সংস্কৃতিতে যারা বিশ্বাসী তাদের বিপর্যয় ঘটেছে।

নাসিক নিবার্চনের আগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করার মধ্য দিয়ে এই মেরুরকরণ শুরু হয়। নিবার্চনের দিন সন্ধ্যায় খবর আসে জেলা, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি বিলুপ্তি করার। পরের দিন নারায়ণগঞ্জ মহানগর শ্রমিক লীগের কমিটি বিলুপ্ত করার পর থেকে শুরু হয়েছে নানা সমীকরণ। অনেকে নতুন করে হিসেব কষতে শুরু করেছেন। আবার কিছু নেতা নানা শঙ্কায় দিন পার করছে। নতুন করে এই ভাঙ্গনের খেলায় কে লাভবান হবেন, আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এ নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

তবে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানাগেছে, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিও যে কোন সময় বিলুপ্ত করা হবে, এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এছাড়া জেলা ও মহানগর যুবলীগের কমিটিও বিলুপ্তির তালিকায় রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবলীগের কর্মকান্ড থাকলেও, নিস্ক্রিয় রয়েছে জেলা যুবলীগের রাজনৈতিক কর্মকান্ড। অন্যদিকে পদের প্রত্যাশায় অনেক নেতার পদের বাইরে থেকে জেলা যুবলীগের রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। নিস্ক্রিয় জেলা যুবলীগকে সক্রিয় করতে হলে নতুন কমিটি গঠনের কোন বিকল্প নেই এমন দাবি বিশ্লেষকদের।

রাজনৈতিক বোদ্ধা মহলের মতে, নাসিক নিবার্চনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণ শুরু হয়েছে। ভাঙ্গনের খেলা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে তা বলা যাচ্ছে না। তবে কেন্দ্রীয় নেতারা চাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলো নতুন করে ঢেলে সাজাতে। আর এ লক্ষ্যেই কাজ শুরু হয়েছে এমন দাবি আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য সূত্রের। ফলে যে কোন সময় যে কোন কমিটি বিলুপ্তি করা হবে। ওই সূত্রের দাবি, জেলা কমিটিগুলোর পাশাপাশি থানা কমিটিগুলোও নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিতর্কীত আর হাইব্রিডদের বাদ দিয়ে নতুন করে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের দিয়ে কমিটিগুলো গঠন করা হবে। আগামী নিবার্চনকে সামনে রেখে এবং বিরোধী দলের আন্দোলনের কথা বিবেচনায় এনে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের বিভাজন স্বাধীনতার পর থেকেই। বিশেষ করে প্রয়াত সামসুজ্জোহা ও আলী আহাম্মদ চুনকার মধ্যে দলীয় বিরোধ থাকলেও তা মাঠ পর্যায়ে তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু ২০১১ সালের নাসিক নির্বাচনের পর উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর বিভাজন প্রকাশ্যে রূপ নেয়। শামীম-আইভী আলাদা বলয় গড়ে তুলে। শামীম ওসমান এম পি হওয়ায় জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগসহ অঙ্গসংগঠনের কমিটির পদগুলিতে শামীম ওসমানের অনুসারিরা স্থান পায় বেশী। তার উপর নাসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত বছরের কয়েক মাস সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে খোকনসাহা সহ শামীম ওসমানের অনুসারিরা প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণ করে সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সভা সমাবেশ শুরু করে। এনিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ আরো চাঙ্গা হয়ে উঠে। এরমধ্যে আইভীর পাশে গাজী গোলাম দস্তগীর, নজরুল ইসলাম বাবুসহ একাধিক নেতা আবস্থান নিয়ে তারা সেলিনা হায়াৎ আইভীর রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করে।

অচিরেই নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের কমিটিসহ অন্যান্য সহযোগি সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করে নাসিক নির্বাচনে ভ’মিকা পালন করেছে এমন লোকদের দিয়ে নতুন কমিটি আসছে বলে এখাধিক সূত্রে জানা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও মাঠে দেখা যায়নি মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজামকে। গত ৪ জানুয়ারি একটি সংবাদে জানা যায়, তিনি করোনা আক্রান্ত! ফলে নৌকার নির্বাচন চলাকালিন তাকে নিস্ক্রিয় দেখা গেছে। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমতির নির্বাচন চলাকালে সরকার দলীয় প্যানেলের পক্ষে শাহ্ নিজামকে সক্রিয় দেখা গেছে। এদিন তিনি সাংসদ শামীম ওসমানের সাথে আদালতপাড়ায় ছিলেন। পুরোটা সময় তাকে সরকার দলীয় প্যানেলের পক্ষে দেখা যায়।

তবে, বিষয়টি কী ছিল, তা কেন্দ্রীয় নেতাদের খতিয়ে দেখা দরকার বলেও তারা মন্তব্য করেন। জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নির্বাচন যাতে করতে না হয় এজন্য সে (শাহ্ নিজাম) করোনা নাটক সাজিয়েছিল। সে কোথায় ছিল, কি করেছিল তা সবার কাছেই খবর আছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মতামত লিখুন........


© All rights reserved © 2018 Alokitonarayanganj24.net
Design & Developed by M Host BD
error: দুঃখিত রাইট ক্লিক গ্রহনযোগ্য নয় !!!