সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০৩ অপরাহ্ন

বই বিমুখ ছাত্র-ছাত্রীরা ফেসবুকে আসক্ত

রণজিৎ মোদক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “সোনার বাংলা গড়তে হলে, সোনার মানুষ চাই”। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্ব প্রথম দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে জাতীয়করণ করলেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীত্ব লাভ করার পর প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ মাধ্যমিক বিদ্যালয় সমূহে কোটি কোটি টাকা মূল্যের বই বিনা পয়সায় ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তুলে দিলেন। তাও আবার পহেলা জানুয়ারি বর্ষ শুরুর প্রাক্কালে। তারপরও বিভিন্ন মহলে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ভাবতে অবাক লাগে! আমরা যখন বিদ্যালয়ে পড়েছি। তখন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি খেলাধুলার মধ্যে কাটিয়েছি। মার্চ-এপ্রিলে বই পেয়েছি। তাও শহর থেকে বড়রা লাইব্রেরি থেকে কিনে এনে দিতেন। নতুন বই অনেকের ভাগ্যে জুটতোও না। পাশ করা উপর ক্লাসের ছাত্রদের কাছ থেকে ৩ ভাগের ২ ভাগ মূল্য দিয়ে কিনতে হতো। একই ক্লাসে কারো নতুন বই, কারো হাতে পুরাতন বই। ধনী-গরীবের কষ্টের ছোঁয়া, অনেক সময় মনকে স্পর্শ করতো। কিন্তু পুরাতন বইয়ের যতœ ছিল। গ্রামে-গঞ্জে তখন বিদ্যুৎ বাতি ছিলনা। হ্যারিকেন কুন্ঠ জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতে হতো। শুনেছি আমাদের গ্রামের মুকুট চৌধুরী মেট্রিক পাশ করার পর তাকে গ্রামের অনেকেই দেখতে গিয়েছিলেন। তখন শিক্ষার প্রতি কদর এবং শিক্ষিত ব্যাক্তির প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল।

যাই হোক, বর্তমান সরকারও শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। বছরের পর বছর শুধু বিনামূল্যে বই-ই বিতরণ করছেন না। উপবৃত্তিসহ শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। শুধু তাই না ! প্রতিটি বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে শ্রেণী পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করছেন। লাখ লাখ টাকার পাশাপাশি সেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন করে লাইব্রেরিয়ান হিসাবে নিয়োগ প্রদান করে তার বেতন প্রদান করছেন। বর্তমান সরকার এবং তার শিক্ষামন্ত্রী যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে বর্তমান প্রজন্মকে শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আসল কথা সুশিক্ষার বিকল্প নেই।

কেন জানি আমার আজগর চাচার কথা মনে পরে যায়। গাও-গেরামের স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান আজগর চাচা। তাঁর একমাত্র সন্তানকে শিক্ষিত করার লক্ষ্যে যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছেন কিন্তু পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না। চাচা দুঃখ করে বলতেন তাঁর সন্তানকে লক্ষ্য করে, “তোরে ময়ূর বানাতে চাই, তুই হইলি মুরগী”। সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যে সকল স্কুলে লাইব্রেরি এবং শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করলেন। সেই সকল লাইব্রেরিতে বইগুলোর উপর ময়লা পড়ছে কিনা তা দেখার কেউ নেই। মূল কথা সেই লাইব্রেরিতে জ্ঞান সাধনা হচ্ছে কিনা ? ছাত্র কিংবা শিক্ষক সেখান থেকে কতটুকু জ্ঞান আহরণ করছেন। কথায় আছে, ভাল শিক্ষক একজন ভাল ছাত্র। আর ভাল ছাত্র হতে হলে বইকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। গীতায় বলা হয়েছে, “শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম্” শ্রদ্ধাবান ব্যাক্তিই জ্ঞান লাভ করতে পারে।

বিমানে আসার পথে পাইলট যাত্রীদের বললেন, বিমানে যান্ত্রিক ক্রুটি দেখা যাচ্ছে যার যার সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করুন। ঐ বিমানে যাত্রী হিসেবে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীজী। একথা শুনে তিনি তাঁর ব্যাগ থেকে দৈনিক পত্রিকা বের করে পড়া শুরু করলেন। বিমান বন্দরে গান্ধীজীকে সাংবাদিকরা পত্রিকা পড়ার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিমান দূর্ঘটনা হলে মৃত্যুতো হবেই। তাই মৃত্যুর পূর্বে পৃথিবীকে জানার জন্য পত্রিকা পড়ছিলাম। এই জানার আগ্রহ কতটা হলে এমন হয়?

বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে জ্ঞানীর হাতের মুঠোয় পৃথিবী। কিন্তু আমাদের সন্তানরা কতটা জ্ঞান অর্জন করছে। রক্ত¯œ্যাত স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা ধরে রাখার দায়িত্ব যাদের হাতে দিতে চান সেই নতুন প্রজন্ম আমাদের কতটা এগিয়ে যাচ্ছে তা দেখার বিষয়। আমি জেলার বেশ কিছু উচ্চ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ও শিক্ষকদের সাথে সাক্ষাৎ করে যা দেখলাম এবং জানতে পারলাম তাতে আমি তেমন তৃপ্তি লাভ করতে পারি নাই। হতাশার অন্ধকারে কারা যেন দাঁড়িয়ে আলো নিভানোর চেষ্টায় কুৎসিত দায়িত্ব পালন করছে। দিন দিন বই পড়ার প্রবণতা ক্ষীণ হয়ে আসছে। পতিটি অভিভাবক চান তার সন্তান যেন মানুষের মতো মানুষ হয়। ঘাম ঝরা অর্থের বিনিময়ে এত ত্যাগ তারপরও যদি তাদের সন্তানরা ময়ূর না হয়ে মুরগী হয়ে যায় তবে এদেশের আজগর চাচাদের দুঃখের শেষ কোথায়?

মানুষ-অমানুষের হিসেব করতে গণনা যন্ত্র ব্যবহার করার ইচ্ছা আমার নেই। সরকার বিনামূল্যে বই ও উপবৃত্তি দিয়ে এমন কি বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে লাইব্রেরি স্থাপন করেও বইমুখী করতে পারছে না। আর সে কথাই ২৭ জুলাই জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার চলো গণগ্রন্থাগার চলো দেখি সম্ভাবনার আলো ক্যাম্পেইনের অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, বই বিমুখ ছাত্র-ছাত্রীরা ফেসবুকে আসক্ত।

কতটুকু দুঃখ নিয়ে একজন জ্ঞানী দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয় থেকে কঠিন সত্য কথা বেড়িয়ে এসেছে। আজ মানুষ অল্প দিনের মধ্যে কিভাবে ধনী হওয়া তা নিয়ে ব্যস্ত। আবার অনেকে গুজবে আসক্ত, কেউ কেউ মাদক সেবনে ব্যস্ত। মানুষের নৈতিক চরিত্র আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। পত্রিকার পাতা উল্টালে ধর্ষণ, খুন লক্ষ্য করা যায়। মাধ্যমিক বিদ্যালয় সমূহে প্রতি বছর গ্রন্থাগার উন্নয়ন তথা গ্রন্থ সংগ্রহের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কার্যত তা দেখা যাচ্ছে। প্রতি বছর বা বছরান্তে অডিটকালীন বই ক্রয়ের ভাউচার দেখিয়ে পাড় পাচ্ছে।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল দেখে আমাদের অভিভাবকদের বুক ভরে যায়। জিপিএ-৫ এর বন্যায় মিষ্টির দোকানগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। আমরা বাঙালী জাতি আমাদের প্রতিটি আনন্দ উৎসবে মিষ্টি চাই-ই। কিন্তু মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে বহু শিক্ষার্থী। এত সুযোগ-সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও এ দৃশ্য দুঃখজনক অবশ্যই। শিক্ষা ক্ষেত্রগুলো বেকার সৃষ্টির কারখানা হিসেবে যাতে চিহ্নিত না হয় সেই লক্ষ্যে সরকার কারিগরী শিক্ষাকে আজ প্রধান্য দিচ্ছেন। শুধু শুধু সার্টিফিকেট শিক্ষা নয় জীবন গড়ার শিক্ষা প্রয়োজন।

এক সময় গ্রামে গ্রামে পুথি পড়ার দৃশ্য চোখে পড়তো। বিকালে বৃদ্ধরা মিলে ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করতেন। মায়েরা সন্ধ্যার পূর্বাহ্নে গৃহের সব কাজ সেরে বিভিন্ন বই পড়তেন। কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্য চোখে চোখে পড়েনা। টেলিভিশন আর মোবাইল যেন গলার মালা হয়েছে। দেখা গেছে বাবা কর্মক্ষেত্রে কাজ করছেন। আর বেশিরভাগ মায়েরা-ই এক ঘরের ভিতরে টিভি-মোবাইলে আসক্ত হয়ে আছেন। আর ছেলে মেয়ে বই পড়ার নামে মোবাইল টিপছে। আগের মায়েরা পড়াশোনা শেষ না বসে থাকতেন। পড়া শেষ হলে সবাই একত্রে খাওয়া-দাওয়া করতো। আগে মা-বাবা সন্তানদের বুঝাতো মানুষ হতে হবে বাবা। এখন সন্তানরা মা-বাবাকে বুঝায় আমরা কি মানুষ না? স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের মাঝে বার্ষিক কিংবা যেকোন পুরস্কার বিতরণী সভায় কাঁচের প্লেট না দিয়ে বই তুলে দিন। বই পড়ায় প্রতিযোগিতা গড়ে তুলে বই পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি করতে হবে। বিদ্যালয়গুলোতে বিতর্ক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মতামত লিখুন........


© All rights reserved © 2018 Alokitonarayanganj24.net
Design & Developed BY N Host BD
error: দুঃখিত রাইট ক্লিক গ্রহনযোগ্য নয় !!!