সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন

সিদ্ধিরগঞ্জে সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে অন্য নারী দিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা!

আলোকিত নারায়ণগঞ্জঃপ্রথম স্ত্রী নাছরিন আক্তার সাথীর সঙ্গে ব্যবসায়ি মোঃ মহসিনের বণিবনা হচ্ছিল না। একারণে গত ৭ মাস আগে তিনি আইরিন জাহানকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। আর তাই প্রথম স্ত্রী ফন্দি আটেন মহসিনকে শায়েস্তা করার। প্রথম স্ত্রীর সাজানো ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে মহসিন এখন নারায়ণগঞ্জ কারাগারে রয়েছেন। অথচ এই ঘটনা সর্ম্পকে আসামী মহসিন ছিলেন পুরোপুরি অন্ধকারে। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থেকেও মামলার আসামী হয়ে গ্রেপ্তার হওয়ায় হতবাক খোদ মহসিন। সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা ও যে বাড়িতে ঘটনা ঘটে সেই বাড়ির মালিককে আদালতে তলব করেছে নারায়ণগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। আগামীকাল বুধবার এই মামলার ধার্য তারিখ রয়েছে।

গত ২৭ সেপ্টম্বর সিদ্ধিরগঞ্জে স্বামীকে খুঁজতে এসে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নারী এই শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনায় কথিত ধর্ষণের স্বীকার নারী (পলি বেগম) বাদি হয়ে দু’জনের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ব্যবসায়ি মোঃ মহসিন ও রমজান নামে দু’জনকে আসামী করা হয়। কিন্তু দু’জন ধর্ষণ করলেও একজন অপরজনকে চেনেন না। ঘটনার দু’দিন পর গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভোরে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় রমজানকে। আর একইদিন মধ্যরাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে ব্যবসায়ি মহসিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার রমজান মামলার বাদি ও ভিকটিম পলি বেগমের স্বামীর ভগ্নিপতি।
বাদী মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন তার স্বামী কারিমুল ইসলাম ঘটনার একমাস আগে তার ছোট বোন রুমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে আসে। বাদি তার স্বামী ও বোনের খোঁজে সিদ্ধিরগঞ্জের সাহেবপাড়ায় এলে ১ নম্বর আসামী মহসিনের সঙ্গে দেখা হয়। মহসিন তাকে তার স্বামী ও বোনের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে এলাকার জনৈক জসিমের নির্মাণাধীন বাড়ির নিচতলায় নিয়ে সঙ্গে থাকা শিশু সন্তান আকিমুলকে পাশের রুমে রেখে তাকে ধর্ষণ করে এবং পরে ২ নম্বর আসামী রমজানও তাকে ধর্ষণ করে।কিন্তু সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে জসিম উদ্দিনের নির্মিতব্য বাড়ির কোথাও দরজা জানালা নেই। ফ্লো জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নির্মান সমগ্রী।
ঘটনাস্থল বাড়ির মালিক জসিম উদ্দিনের ভায়রা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার ভায়রা প্রবাসে থাকে। আমি গত দেড় বছর ধরে ভায়রার হয়ে এই বাড়ির কাজ করাচ্ছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শ্রমিকরা কাজ করে। সন্ধ্যা ৭টার পর আমি প্রধান গেটে তালা লাগিয়ে দেই। ৫ জন শ্রমিক ভবনেই থাকে। ভবনের নিচ তলার পুরো ফ্লোরে পানি। ইট সিমেন্ট, বালু এবং সরঞ্জামাদী ছড়িয়ে ছটিয়ে আছে। উত্তর পাশে অন্যভবনের ভাড়াটিয়ারা বসবাস করছে। তাছাড়া এমন খোলামেলা রুমে ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে আর ভবনের লেবার ও পাশের ভবনের মানুষ শব্দ পাবে না এটা বিশ্বাস করতে কস্ট হচ্ছে। তাছাড়া আমার ভবনের প্রবেশের প্রধান গেটে তালা থাকে। নির্মণাধীন ভবনের কনস্ট্রাকশন কাজে নিয়োজিত শ্রমিক জহিরুল, আদিল ও কাদির জানান, আমরা চারজন ভবনের দোতলায় রাতে থাকি। এখানে থেকেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করি। এই ভবনের এমন কোন ঘটনা ঘটলে তো আমাদের জানার কথা।
ওই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত মহসিনের ছোট ভাই বেলাল হোসেন বলেন, আমার ভাই যদি কোন ঘটনায় সমস্যায় পড়ে তাহলে তো সবার আগে তার স্ত্রী এগিয়ে আসার কথা। কিন্তু আমার ভাইকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ গত ২৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে গ্রেপ্তার করার পর আমার ভাবী (ভাইয়ের প্রথম স্ত্রী) ও তার ভাইদের নিয়ে আমার ভাইয়ের উত্তারার ১৪নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর রোডস্থ রূপালী গ্রুপের অফিসে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে অফিসিয়াল গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস, চেকবই ও জায়গা-জমির কাগজপত্রসহ ৬ লাখ ৭৫ হাজার নগদ টাকা নিয়ে যায়। এছাড়া থানায় এসে মহসিনের সঙ্গে দেখা করে প্রথম স্ত্রী নাছরিন নগদ ৩০ লাখ টাকা ও ব্যবসার অংশীদারিত্ব দাবি করেন। এগুলো দিলে তিনি মামলাটি আপোষ মিমাংসা করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এথেকে আমাদের অনুমান যে বড় ভাবীই এ ঘটনা সাজিয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ৭ মাস আগে আমার ভাই দ্বিতীয় বিয়ে করে। এরপরই আমার বড় ভাবী তাকে শায়েস্থা করার জন্য এবং সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার জন্য নানা ফন্দি করে। তারই অংশ হচ্ছে ভাড়া করা অন্য নারীকে দিয়ে কথিত ধর্ষণ মামলা। যা সুষ্ঠ তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
এদিকে মামলার দ্বিতীয় আসামী রমজানের এক নিকটাত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশ গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভোরে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার কেশবগঞ্জ থেকে রমজানকে গ্রেপ্তার করে। সে বাদী পলি বেগমের দ্বিতীয় স্বামী কারিমুল ইসলামের ভগ্নিপতি।
রমজানের ওই আত্মীয়ের দাবি, রমজান কখনই নারায়ণগঞ্জে আসেননি। উল্লাপাড়ায় চা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি আরও বলেন ‘দুই বছর ধইরা রমজানের সঙ্গে তার শালা কারিমুল ইসলামের সঙ্গে ওই মেয়ের (পলি বেগমের) কোন সম্পর্ক নাই। এখন শুনি তার ছোটবোনকে নিয়ে পালাইছে। স্বামীকে কোনোভাবেই ধরার সুযোগ পাইতেছে না।
রজমানের স্ত্রী মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার স্বামী বাড়িতে ঘুমাইয়া ছিল। তারে ফাঁসানোর লাইগা এই মামলা করা হইছে। যে জীবনে কখনও ঢাকা নারায়ণগঞ্জে যায় নাই সে কেমনে নারায়ণগঞ্জে গিয়া ধর্ষণ করলো?’মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন রমজান চা বিক্রেতা। তার কল লিস্ট চেক করে দেখা গেছে সে ঘটনার আগে পরে সিদ্ধিরগঞ্জে আসেনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) ইশতিয়াক আশফাক রাসেল বলেন, ঘটনার পর ওই নারী ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করেন। পরে আমরা থানা থেকে একজন এসআইকে ঘটনাস্থলে পাঠাই। কিন্তু ওই নারী কোথায় ধর্ষিত হয়েছে সেই ঘটনাস্থল চিহ্নিত করতে পারেনি। তাকে নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ রাতভর ঘটনাস্থল সনাক্তের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরদিন সকাল ৯টায় ওই নারী জানায় সে জনৈক জসিমের নির্মাণাধীন ভবনের নিচতলার একটি রুমে ধর্ষিত হয়েছে। পরে থানায় মামলা দায়ের করেন ওই নারী।
তিনি আরও বলেন, মামলার দুই আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভিকটিম (ধর্ষিতা) ও বিবাদীদের ডিএনএ’র নমুনা সংগ্রহ করানো হয়েছে। আশা করি অল্প কয়েকদিনের মধ্যে ডিএনএ’ টেস্ট রিপোর্ট হাতে পাবো। ওই রিপোর্ট পেলেই প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত আমাকে এবং মামলার বাদীনি ও ঘটনাস্থল বাড়ির মালিককে আগামী ২১ অক্টোবর আদালতে তলব করেছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাদের মনে হয়েছে যে ধর্ষণ মামলাটি সাজানো। কোন পক্ষ অবৈধ সুবিধা নিয়ে মামলাটি করিয়েছে। কারণ দরজা জানালা নেই এমন একটি বাড়ির নিচ তলায় রাত ৮টার দিকে ধর্ষণের ঘটনা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তাছাড়া বাদি মামলায় উল্লেখ করেছেন ঘটনার সময় তার সঙ্গে তার ২ বছর ৬ মাস বয়সী সন্তান ছিলো। অন্ধকার কক্ষে স্বাভাবিক ভাবেই শিশুটির কান্নাকাটি করার কথা।

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মতামত লিখুন........


© All rights reserved © 2018 Alokitonarayanganj24.net
Design & Developed by M Host BD
error: দুঃখিত রাইট ক্লিক গ্রহনযোগ্য নয় !!!