বুধবার, ০৪ অগাস্ট ২০২১, ০৮:২০ পূর্বাহ্ন

সোনারগাঁও জলাশয় রক্ষা ও সাইকেল লেন তৈরিতে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

কোচিং বাণিজ্য বন্ধ : হাইকোর্ট
ফাইল ছবি

আলোকিত নারায়ণগঞ্জঃদেশের জলাশয়কে জাতীয় সম্পদ উল্লেখ করে সব ধরনের জলাভূমি রক্ষা, উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক আইন এবং পৃথক (জলাভূমি মন্ত্রণালয়) মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দ্রুত জলাভূমি সুরক্ষা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার ছয়টি মৌজার (পিরোজপুর, জৈনপুর, ছয়হিস্যা, চরভবনাথপুর, বাটিবান্ধা এবং রতনপুর) কৃষিজমি, জলাভূমি, মেঘনা নদীর অংশ ভরাট করে ‘সোনারগাঁও রিসোর্ট সিটি’ এবং ‘সোনারগাঁও ইকোনমিক জোন’ নির্মাণ কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত হাইকোর্টের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা এক রিট মামলায় সোনারগাঁও-এ ইউনিক প্রপার্টিজের অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ অবৈধ ঘোষণা করে ছয় মাসের মধ্যে মাটি সরিয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়ে রোববার (১৮ জুলাই) সন্ধ্যায় ১৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে, হাইকোর্ট জলাশয়কে জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করে দেশের প্লাস্টিকের ব্যাগ নিষিদ্ধ করারও নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব সড়ক-মহাসড়কে পৃথক সাইকেল লেন তৈরির করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশকে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এজন্য সরকারকে পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছে রায়ে।

বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় লেখেন। আদালতে এই রিট মামলায় বেলার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল, অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মিনহাজুল হক চৌধুরী, আলী মুস্তফা খান ও সাঈদ আহমেদ কবীর। অপরপক্ষে ছিলেন মুরাদ রেজা, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, আবু তালেব প্রমুখ আইনজীবী।

জলাভূমি রক্ষায় ১১ নির্দেশনা

এক. যেহেতু বাংলাদেশ রামশার কনভেনশন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করেছে সেহেতু উক্ত অঙ্গীকার এবং চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুত জাতীয় নীতিমালা গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত দায়িত্ব ও কর্তব্য।

দুই. ‘তুরাগ নদী’ রায় মোতাবেক সব জলাভূমি পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি তথা জনগণের ন্যায় সম্পত্তি তথা জাতীয় সম্পত্তি।

তিন. সব জলাভূমির সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে অনতিবিলম্বে পৃথক জলাভূমি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা।

চার. জলাভূমি রক্ষা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় দ্রুত আইন প্রণয়ন।

পাঁচ. নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুর, জৈনপুর, চরহিস্যা, চরভবনাথপুর, ভাটিয়াবান্দা এবং রতনপুর মৌজার কৃষি জমি, নিচু জমি এবং জলাভূমি কী পরিমাণ দখল এবং বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে তার পরিমাণ এবং ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করার জন্য পরিবেশ অধিফতর এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ প্রদান করা হলো।

ছয়. অত্র রায়ের কপি প্রাপ্তির ছয় মাসের মধ্যে উল্লিখিত ছয়টি মৌজার জায়গা পূর্বাস্থায় ফিরিয়ে আনতে পরিবেশ অধিদফতর এবং স্থানীয় প্রশাসনকে বলা হয়েছে।

সাত. এ ছয়টি মৌজায় মাটি ভরাটের বিষয়টি তদন্ত করে ছয় মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।

আট. অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০ এর অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আবেদন করতে হলে আবেদন পত্রের সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র সংযুক্ত করণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

নয়. ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রণয়নের ক্ষেত্রে এসপিএ, আরআর এসও স্যাটেলাইটের সাহায্যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশেল সব জলাভূমির ভৌগলিক অবস্থান নির্ণয় এবং জীববৈচিত্র বিষয়ক তথ্যাদি সংগ্রহ পূর্বক সব ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলার ম্যাপ প্রস্তুত করতে হবে।

দশ. দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে অন্তত একদিন এক ঘণ্টার জন্য জলাভূমির প্রয়োজনীয়তা, উপকারিতা, রক্ষাসহ সব বিষয়ে আলোচনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দেশিকা জারি করবে।

এগার. দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায়ে তিন মাস অন্তর অন্তর জলাভূমির ওপরে আলোচনা, সেমিনার করার ব্যবস্থা করবে।

এছাড়া রায়ে পরিবেশবান্ধব উন্নত দেশ গড়তে ১৪টি বিষয়ের ওপর মতামত দিয়েছে হাইকোর্ট। নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন প্রণয়ন, নবায়ন যোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা। এ নিয়ে কমিশনও গঠন করতে বলা হয়েছে।

ঢাকাসহ দেশের সব সড়কে সাইকেল লেন তৈরি করার মতামত দিয়ে আদালত বলেন, এটি দেশকে উন্নত করবে। সেই সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যাগ বন্ধেও মত এসেছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের যেমন সুন্দরবন, বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ রক্ষা, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার রক্ষায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও গঠন করতেও মত দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশকে পরিবেশবান্ধব করতে এ রায় প্রধানমন্ত্রীর দফতরসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি অফিসে দ্রুত পাঠানোরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ইউনিক প্রপার্টিজ ডেভলপমেন্ট লি. নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর, জৈনপুর, ছয়হিস্যা, চরভবনাথপুর, বাটিবান্ধা এবং রতনপুর মৌজার কৃষিজমি, জলাভূমি, মেঘনা নদীর অংশ ভরাট করে সোনারগাঁও রিসোর্ট সিটি প্রকল্প নির্মাণ করছিল। এই নির্মাণ কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণার জন্য বেলা ২০১৪ সালে রিট আবেদন করে। এ আবেদনে ওই বছরের ২ মার্চ হাইকোর্ট প্রকল্প এলাকার মাটি বা বালি ভরাটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। একইসঙ্গে ইতোমধ্যে ভরাটকৃত ভূমি থেকে মাটি/বালি অপসারণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি রুল জারি করেন। এ রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট গতবছর ২ ডিসেম্বর রায় দেন। যার পূর্ণাঙ্গ রায় আজ সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ওয়েসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মতামত লিখুন........


© All rights reserved © 2018 Alokitonarayanganj24.net
Design & Developed by M Host BD
error: দুঃখিত রাইট ক্লিক গ্রহনযোগ্য নয় !!!