শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২০, ০৪:০৭ পূর্বাহ্ন

কে হচ্ছেন না’গঞ্জের পরবর্তী কিং?

আলোকিত নারায়ণগঞ্জ : প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জ। নানা কারনেই দেশবাসীর কাছে এ জেলার পরিচিতি ব্যাপক। দেশে উন্নয়ণের এক রোল মডেল বলা হলেও সন্ত্রাসের জনপদ খ্যাত অশান্ত শহর নারায়ণগঞ্জ। খুন, গুম ও ধর্ষন ছাড়াও আরও অনেক হৃদয় বিদারক ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে এই শহরে। তবে প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত এই শহরে কখনই কেউ চায়নি ওই সব নারকীয় ঘটনা ঘটুক। আর তাই খুন, গুমসহ সকল সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করতে মুক্তিযুদ্ধের পর রাজ্যে শাসন করেছেন অনেক জনপ্রতিনিধি। তবে, জনপ্রতিনিধিদের সাথে সাথে অনেকেই পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জের কিং নামক উপাধিটি। কেউ পেয়েছেন তার সাথে কিং মেকার উপাধিও। যার ধারাবাহিকতায় শহরের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রথম কিং উপাধি পেয়েছিলেন ওসমান পরিবারের কর্ণধার এবং প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমান বর্তমান সাংসদ সেলিম ওসমান এবং শামীম ওসমানের পিতা একে এম সামসুজ্জোহা, এরপর কিং উপাধি পেয়েছিলেন বর্তমান সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পিতা আলী আহম্মদ চুনকা, তারপর কিং উপাধিসহ আরেকটি উপাধি কিং মেকার বলা হয় সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীকে আর বর্তমান কিং এর মুকুট নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের মাথায়। তবে সম্প্রতি এক জনসভায় বর্তমান কিং প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি আর আগামীতে সংসদ নির্বাচন করবেন না। এ ঘোষণার অনেক আগেই সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, আমলা, সুশীল সমাজের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন ‘কে হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের পরবর্তী কিং’? সেই ঘোষণার পর শহরের শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন।

আয়তনে দেশের সবচেয়ে ছোট জেলা বলা হয়ে থাকে নারায়ণগঞ্জকে। তবে আয়তনে ছোট হলেও রাজধানী পর এই কম জায়গার মধ্যেই মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে। আয়তনে ছোট হলেও প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বসবাস এখানে। এই শহর নিয়ন্ত্রনের জন্য ধারাবহিকভাবে কিং এর গুরুত্ব অপরিসীম। সাংসদ শামীম ওসমানের নির্বাচন না করার ঘোষনার পরই গুঞ্জন হাজারো মানুষের মধ্যে। নগরবাসী চায়, শহরের সকল অন্যায় অত্যাচার বন্ধ করার জন্য শামীম ওসমানের পর ধারাবহিকভাবে শহর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জের কিং হবেন একজন ভালো মানুষ। এক নজরে সাবেক কিংদের পরিচিতি:

কিং একেএম সামসুজ্জোহা:

তিনি ১৯২৪ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম খান সাহেব এম. ওসমান আলী এবং মাতার নাম জামিলা ওসমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর রাজনীতির মাঠে আসেন ওসমান পরিবারের দ্বিতীয় প্রজম্ম খান সাহেব ওসমান আলীর ছেলে কিং একেএম শামছুজ্জোহা। ৭০-এর প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচনে তিনি পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে খান সাহেব ওসমান আলী মৃত্যুবরণ করেন। এই পরিবারের সাথে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯৭৩ সালে শামসুজ্জোহা জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ অবদান রাখায় তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়। একেএম শামসুজ্জহার তিন ছেলে-নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান। তিনি ১৯৮৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মারা যান।

কিং আলী আহম্মদ চুনকা:

আলী আহম্মদ চূনকা নারায়ণগঞ্জের একটি পরিচিত নাম। মৃত্যুর ৩৪ বছর পরও তিনি আজও নারায়ণগঞ্জবাসীর মাঝে জীবিত। রাজ্যে সৈন্য আর মুকুট ছাড়াই তিনি নারায়ণগঞ্জের সকল মানুষের মনের রাজা ছিলেন। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন আলী আহম্মদ চুনকা। স্বাধীনতার পর তিনি আওয়ামী লীগের পাশাপাশি শ্রমিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দিন দিন নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আলী আহম্মদ চুনকা। তিনি নারায়ণগঞ্জের প্রথম নির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান। তিনি দুবার নারায়ণগঞ্জের পৌর চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৮০ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রতিদ্বন্ধী ওসমান পরিবারের একেএম শামছুজ্জহাকে হারিয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন আলী আহম্মদ চুনকা। আলী আহম্মদ চূনকার পাঁচ সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তান সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি পেশায় একজন ডাক্তার। ১৯৮৪ সালে চূনকার মৃত্যুর পর ১৯৮৫ সালে আইভী বৃত্তি নিয়ে পড়তে চলে যান দেশের বাইরে।

কিং মোহাম্মদ আলী:

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির অঙ্গনে বেশ পরিচিত মুখ কমান্ডার মোহাম্মদ আলী। সুদর্শন এ ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জ তো বটেই বাংলাদেশে বেশ আলোচিত। তবে ফতুল্লার লোকজনদের জন্য তিনি আশীর্বাদও বটে। তিনি বিএনপির রাজনীতিতে থেকে বহু পরিচিতি পেলেও তাঁর কাছে রাজনৈতিক কোন ভেদাভেদ নাই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের কাছে তিনি ‘কিং মেকার’ হিসেবেই পরিচিত। পর্দার আড়ালের অন্তরালে অনেক ঘটনার নায়ক তিনি। জনপ্রতিনিধি বানানো থেকে শুরু করে এমপি বানানো পর্যন্ত অনেক কাজেই তিনি বেশ পারদর্শী। ১৯৯১ সালে দেয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন মোহাম্মদ আলী। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে তিনি বিএনপির টিকেটে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর তখন থেকেই তিনি বিএনপির প্রতি দুর্বল হয়ে উঠেন। শিল্পপতি এ নেতার সঙ্গে তখন থেকেই বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের যোগাযোগ থাকতো। ২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচন হলেও জুলাই থেকেই সংসদ নির্বাচনের দামামা তখন শুরু। বিএনপি তখন প্রার্থী খুজে পাচ্ছিল না। সবাই মোহাম্মদ আলীকে চাপ দিতে থাকে নির্বাচনের জন্য। কিন্তু কিং মেকার নির্বাচনে সরাসরি যেতে রাজী না। নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতেই প্রয়াস তার। যার ফলে তার আর্শিবাদে শামীম ওসমানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হন গিয়াসউদ্দিন। অনেকের মতে, স্থানীয় পর্যায় ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে অনেক আগেই কিং মেকার খ্যাতি পেয়েছেন তিনি। এছাড়া ব্যবসায়ী মহলেও তার রয়েছে ভিন্ন এক আমেজ। অনেকের কাছেই তিনি মুরব্বি হিসেবে সম্মানিত। দেশের রাজনীতিতে বিশাল এক ফ্যাক্টর দাদা ভাই (মোহাম্মদ আলী)। বিভিন্ন রাজনীতিকের জন্য তিনি পথপ্রদর্শক।

বর্তমান কিং একেএম শামীম ওসমান:

৮ম শ্রেনীতে পড়াশোনা অবস্থায় ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু করেন রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবন। পরবর্তীতে সরকারী তোলারাম কলেজে ছাত্রছাত্রী সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। তোলারাম কলেজ ছাত্রছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভিপি থাকাকালীন সময় থেকেই শামীম ওসমানের জনসেবার কার্যক্রম ব্যাপক বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে নন্দিত ছাত্র নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। তোলারাম কলেজের বহু গরীব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পৃষ্টপোষক হিসেবে সকল ছাত্রছাত্রীর কাছে অত্যন্ত প্রিয়জন হয়ে ওঠেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য ও নির্বাচনের মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৬ সালে নারায়নগঞ্জ ৪ (ফতুল্লা-সিদ্বিরগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ২০১৪ সালে। আর সর্বশেষ ২০১৮ সালে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে, বিভিন্ন সময়ে চমকপ্রদ ও নানা ঘটনা অঘটেনের জন্য খবরের শিরোনাম হওয়া ওসমান পরিবারের তিন পুরুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে শামীম ওসমানের আছে বিপুল বৈচিত্র। নারায়নগঞ্জবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শুরু হয় তার আধুনিক নারায়নগঞ্জ গড়ার কার্যক্রম। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন আন্দোলন, সগ্রাম ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ওসমান পরিবারের এই ছোট ছেলে বিভিন্নভাবে অবদান রেখে আসছে। এভাবেই মেধাবী পরিশ্রমী দক্ষ সংগঠক হিসেবে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে এগোতে থাকেন আজকের কিং একেএম শামীম ওসমান।

তবে কিছুদিন আগে এক জনসভায় কিং শামীম ওসমান হাজারো মানুষের সামনে ঘোষণা প্রদান করেন যে তিনি আর কোন নির্বাচন করবেন না। সুতরাং শামীম ওসমান যদি আর নির্বাচন না করে তাহলে নারায়ণগঞ্জের পরবর্তী কিং কে হতে যাচ্ছেন। শামীম ওসমানের পর নিয়ন্ত্রণহীন এই শহরের দায়িত্ব কে নিতে যাচ্ছেন?

নিউজটি শেয়ার করুন...

আপনার মতামত লিখুন........


© All rights reserved © 2018 Alokitonarayanganj24.net
Design & Developed BY N Host BD
error: দুঃখিত রাইট ক্লিক গ্রহনযোগ্য নয় !!!