মেসির চোখের জলে লেখা হলো প্রত্যাবর্তনের রুপকথা। এমন ম্যাচকে তাই অবিশ্বাস্য মনে করছেন খোদ মেসিই। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে আরও একবার ম্যাচসেরা হয়ে তিনি বলছেন এই আর্জেন্টিনা কখনো হাল ছাড়ে না; শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়। লক্ষ্য স্থির রেখে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গোলটাই যেন মনে করিয়ে দিলেন এলএমটেন।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দিবাগত রাতে ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা; আর শেষ বাঁশি বাজতেই ৩-২ গোলের নাটকীয় এক জয়ের রোমাঞ্চ। বিশ্বকাপের মঞ্চে দলটা যখন আর্জেন্টিনা তখন যেকোনো ব্লকবাস্টার মুভির ক্লাইম্যাক্সের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এই ঘটনা। মেসিও মনে করেন এমনটাই।
প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া কিংবা মেসির পেনাল্টি মিসের লজ্জার রেকর্ড সঙ্গী হয় আলবিসেলেস্তাদের। তবে রঙ-তুলির ক্যানভাসে শেষ আঁচড়টি টেনে একই আসরে দুটি ভিন্ন দলের বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের আক্ষেপটা মিটিয়ে দেন এলএমটেন। প্রথম গোলে অ্যাসিস্টের পাশাপাশি তার বা পায়ের জাদুতে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিতের পর পুরো দলকে প্রশংসায় ভাসান অধিনায়ক।
মেসি বলেন, আমি খুবই আনন্দিত। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর এভাবে ম্যাচ জেতা অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকর। এই দল কখনো হাল ছাড়ে না এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই করে। সত্যি বলতে এমন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ বিষয় ছিল না।
আর্জেন্টিনার মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের জয়ে এখানেই সন্তুষ্ট থাকতে চান না মেসি। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের তকমা ধরে রাখতে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার তাগিদও দেন এলএমটেনের।
লিও বলেন, আমাদের অনেক ভুগতে হয়েছে, তবে বিশ্বকাপ এমনই। এখানে প্রতিটি ম্যাচই এভাবে কঠিন হয় এবং দলগুলোর শক্তি খুবই কাছাকাছি। তবে লক্ষ্য থেকে সরে আসা চলবে না আমাদের।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয়ার্ধে ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের পুনর্জন্মে পালে হাওয়া লাগে আর্জেন্টিনার। শক্ত হাতে দাঁড় টেনে যেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিজ দেশকে পৌঁছে দেয়ার চ্যালেঞ্জই নিয়েছিলেন লিও।

মিশরের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের পর আবেগে ভেঙে পড়েন লিওনেল মেসি। নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, এই কান্নার পেছনে ছিল একদিকে ‘স্বস্তি’ আর অন্যদিকে পেনাল্টি মিসের ‘হতাশা’।
মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এই ম্যাচেই বাদ পড়ার শঙ্কায় ছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলের পর ৬৭ মিনিটে দুর্দান্ত এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন মুস্তাফা জিকো।
এর আগে ১৫ মিনিটে ইব্রাহিমের হেডে করা গোল শোধ করার সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। বক্সের ভেতর হাইসেম হাসা ফাউল করেছিলেন নিকলাস তালিয়াফিকোকে। তবে মেসির নেওয়া পেনাল্টি সহজেই ঠেকিয়ে দেন মোস্তফা শোবেইর।
বিশ্বকাপে এ নিয়ে আটটি প্রচেষ্টার মধ্যে চারটি পেনাল্টিতেই ব্যর্থ হলেন মেসি। মিসের পর তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ম্যাচের ফলাফল নিয়ে কতটা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন তিনি।
তবে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ীরা হার মানেননি। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেডে করা গোলে ব্যবধান কমানোর পর মেসি ও এনজো ফার্নান্দেজের গোলে ১৩ মিনিটের রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তনে জয় নিশ্চিত হয় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে।
খেলা শেষে মিক্সড জোনে মেসি বলেন, ‘আমরা আবারও অনেক কষ্ট করেছি। তবে এটাই বিশ্বকাপ, প্রতিটি ম্যাচই খুব কাছাকাছি ব্যবধানের হয়। তাই আমি অনেক খুশি।’
সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দের মুহূর্তে চোখের পানি ফেলতে দেখা যায় মেসিকে। এই আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘সবার জন্যই এটা ছিল একধরনের স্বস্তি।’
তিনি আরও বলেন, ‘২-০ ব্যবধান থেকে ফিরে আসা সহজ নয়। কিন্তু এই দলটা কখনো হাল ছাড়ে না, তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যায়।’
মেসি বলেন, ‘আমরা ভাগ্যক্রমে কুতির [রোমেরো] গোলটা তাড়াতাড়ি পেয়ে গিয়েছিলাম। এরপর আমরা খেলা ঘুরিয়ে দিতে পেরেছি এবং নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই জিতেছি।’
তিনি বলেন, ‘আজ এই দল যা করে দেখাল, তা অবিশ্বাস্য। আমি খুব খুশি যে মানুষ আমাদের খেলা উপভোগ করতে পারছে।’
তবে ২১ মিনিটে পেনাল্টি মিসের বিষয়টি এখনো পোড়াচ্ছিল মেসিকে। তিনি বলেন, ‘পেনাল্টি নিয়ে আমি সত্যিই হতাশ ছিলাম, সেটা মিস করা এবং বিষয়টা খারাপভাবে নেওয়া নিয়ে। আমি যদি সেই পেনাল্টিতে গোল করতাম, তাহলে খেলার পুরো চিত্রটাই বদলে যেত।’
মেসি বলেন, ‘আমাদের স্পষ্ট কিছু সুযোগ ছিল আর তাদের গোলরক্ষক অসাধারণ কিছু সেভ করেছেন। দলের ভেতরে যা ঘটেছিল, তার পর এই দলকে সাহায্য করতে পারাটা আমার জন্য বিশেষ কিছু।’
এই জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেছে লিওনেল স্কালোনির দল। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে সুইজারল্যান্ড।
এই বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা এখন আট। এতে কিলিয়ান এমবাপে ও আর্লিং হালান্ডের চেয়ে এক গোলে এগিয়ে গেলেন তিনি। ছয়টি বিশ্বকাপে ৩১ ম্যাচ খেলে মেসির মোট গোল এখন ২১টি, যা এমবাপের চেয়ে দুটি বেশি। এমবাপে ১৯ ম্যাচে করেছেন ১৯ গোল।