বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনার পরিচয় শুধু বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরির দেশ হিসেবেই নয়, এখন তারা হয়ে উঠেছে বিশ্বসেরা কোচ তৈরিরও এক উর্বর ভূমি। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই প্রভাব স্পষ্ট। ৪৮ দলের আসরে সর্বোচ্চ ছয়জন আর্জেন্টাইন প্রধান কোচ নেতৃত্ব দিচ্ছেন ছয়টি ভিন্ন দেশকে। তারা হলেন—লিওনেল স্কালোনি (আর্জেন্টিনা), মার্সেলো বিয়েলসা (উরুগুয়ে), মাউরিসিও পোচেত্তিনো (যুক্তরাষ্ট্র), নেস্তর লরেঞ্জো (কলম্বিয়া), সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে (ইকুয়েডর) এবং গুস্তাভো আলফারো (প্যারাগুয়ে)। আর্জেন্টিনার কোচিং দর্শনের বৈশ্বিক প্রভাবের এটিই সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
সবচেয়ে আলোচনায় আছেন অবশ্যই লিওনেল স্কালোনি। কাতার বিশ্বকাপজয়ী এই কোচের অধীনে শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা প্রথম দুই ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে আগেভাগেই শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করে। আলজেরিয়াকে ৩-০ এবং অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপসেরা হিসেবেই নকআউটে ওঠে আলবিসেলেস্তেরা। লিওনেল মেসির দুর্দান্ত ফর্মের পাশাপাশি স্কালোনির কৌশলগত নমনীয়তাও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নেস্তর লরেঞ্জোর কলম্বিয়াও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। উজবেকিস্তান ও ডিআর কঙ্গোকে হারিয়ে টানা দুই জয়ে পূর্ণ ছয় পয়েন্ট সংগ্রহ করে তারা সবার আগে নকআউট নিশ্চিত করেছে। শক্তিশালী ও সংগঠিত ফুটবল খেলছে কলম্বিয়া, যা লরেঞ্জোর অধীনে গত কয়েক বছর ধরেই তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
আর্জেন্টাইন কোচদের মধ্যে আরেকটি বড় সাফল্যের নাম সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে। শুরুটা ছিল হতাশাজনক—আইভরি কোস্টের কাছে হার এবং কুরাসাওয়ের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র। কিন্তু গ্রুপের শেষ ম্যাচে জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে ইকুয়েডর। ম্যাচ শেষে বেকাসেসে এটিকে ইকুয়েডরের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় বলে অভিহিত করেন। এই জয়ে সেরা তৃতীয় দলগুলোর একটি হিসেবে শেষ বত্রিশে জায়গা করে নেয় তার দল।
স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা মাউরিসিও পোচেত্তিনোও নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই দলকে নকআউটে তুলেছেন। গ্রুপের শেষ ম্যাচে তুরস্কের কাছে হারলেও ততক্ষণে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তাই সেই হারকে বড় করে দেখেননি পোচেত্তিনো। বরং তার মতে, মূল লক্ষ্য ছিল গ্রুপের শীর্ষে থেকে নকআউটে ওঠা, সেটিই অর্জন করেছে দল।
অন্যদিকে গুস্তাভো আলফারোর অধীনে দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা প্যারাগুয়ে প্রত্যাশা জাগিয়েছে। বাছাইপর্বে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে দলকে বিশ্বকাপে তুলেছিলেন তিনি। মূল পর্বেও শৃঙ্খলাবদ্ধ ও রক্ষণভিত্তিক ফুটবলে প্রতিপক্ষকে ভোগাচ্ছে আলফারোর দল। নকআউটের লড়াইয়ে টিকে থাকতে শেষ গ্রুপ ম্যাচটি তাদের জন্য নির্ধারণী হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় রয়েছেন মার্সেলো বিয়েলসা। আক্রমণাত্মক ফুটবলের জনক হিসেবে পরিচিত এই কিংবদন্তি কোচের উরুগুয়ে প্রথম দুই ম্যাচে প্রত্যাশিত ফল পায়নি। সৌদি আরব ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে টানা দুই ড্রয়ের পর তাদের নকআউটের সমীকরণ জটিল হয়ে পড়ে। তবে বিয়েলসার মতো অভিজ্ঞ কোচের ওপর এখনো আস্থা রাখছেন উরুগুয়ের সমর্থকেরা।
এখন পর্যন্ত ছয় আর্জেন্টাইন কোচের মধ্যে লিওনেল স্কালোনি (আর্জেন্টিনা), নেস্তর লরেঞ্জো (কলম্বিয়া), সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে (ইকুয়েডর) এবং মাউরিসিও পোচেত্তিনো (যুক্তরাষ্ট্র) নিশ্চিতভাবে শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছেন। গুস্তাভো আলফারোর প্যারাগুয়ে এবং মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ে নিজেদের শেষ গ্রুপ ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর করছে।
ফুটবলের ভাষা ভিন্ন হতে পারে, জার্সির রংও আলাদা। কিন্তু এই বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, ডাগআউটের এক বড় অংশে এখনো রাজত্ব করছে আর্জেন্টাইন কোচিং দর্শন। খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে সফল কোচ রপ্তানিতেও যে আর্জেন্টিনা অনন্য, ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন তারই আরেকটি জ্বলন্ত প্রমাণ।