জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর আগমন উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ফল উৎসব অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মঞ্চ দুই দফায় প্রকাশ্য দিবালোকে ভেঙে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা।
এ সময় হামলাকারীরা মঞ্চের সামনে থাকা চেয়ার টেবিল ভাঙচুর করে এবং প্যান্ডেল খুলে ফেলে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে এনসিপির অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যায় এবং শনিবার (৬ জুন) বিকালে উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ ঘটনা ঘটে।
এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে প্যান্ডেলে হামালা চালিয়ে ভাংচুর করে এবং এনসিপির নেতাদের এলোপাথাড়ি মারধর করে আহত করে। এ সময় পুলিশের নীরব ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এনসিপির নেতারা।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে গিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান হুমায়ুন এনসিপি নেতাকর্মীদের রোশানলে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রূপগঞ্জ উপজেলার এনসিপির আয়োজনে ফল উৎসবের প্যান্ডেল করা হয়। শনিবার (৬ জুন) বিকালে অনুষ্ঠিত ফল উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপির) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর। ফল উৎসব ঘিরে আগের দিন থেকেই প্যান্ডেল ও মঞ্চ তৈরির কাজ চলছিল।
শুক্রবার রাত ৮টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওই মঞ্চ ও প্যান্ডেল ভেঙে ফেলা। এতে করে এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এরপর স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ফল উৎসব সফল করার লক্ষ্যে আবারও প্রস্তুতি নেয় এনসিপি নেতাকর্মীরা।
পরে শনিবার বিকাল ৩টার দিকে প্যান্ডেল ও মঞ্চ তৈরীর প্রস্তুতি চলাকালীন সময়ে হঠাৎ করে ৫০ থেকে ৬০ টি মোটরসাইকেলে একদল দুর্বৃত্ত দেশীয় ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আবার মঞ্চ ভাঙচুর শুরু করেন । এ সময় মঞ্চের সামনের চেয়ার টেবিল ব্যাপক ভাঙচুর করে। এ ছাড়া প্যান্ডেলও খুলে ফেলা হয়। ঘটনার সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উপস্থিত লোকজন আশপাশে ছোটাছুটি করতে শুরু করে।
হামলাকারীদের হামলায় এনসিপির রূপগঞ্জ উপজেলা যুগ্ন সদস্য সচিব ফারাবি হাসান, নারায়ণগঞ্জ জেলা যুগ্ন সদস্য সচিব ইউসুফ মোল্লা, জাতীয় যুব শক্তি কেন্দ্রীয় সংসদ সিনিয়র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাতসহ এনসিপির অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন। আহতদের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন স্থানে ভর্তি করা হয়েছে। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে গিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান হুমায়ুন এনসিপি নেতাকর্মীদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় এনসিপি নেতাকর্মীরা ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দেন। একপর্যায়ে নেতাকর্মীদের রোশানলে পড়েন তিনি।
জাতীয় যুব শক্তি কেন্দ্রীয় সংসদ সিনিয়র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত জানান, আওয়ামী ফ্যাসিবাদি কায়দায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ফল উৎসবের প্যান্ডেল ভাঙচুরের অর্ধশত ক্যডার নিয়ে এসে মঞ্চ ভাংচুর করে এবং আমাকেসহ ১০ জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করে। ছাত্রদলের এ কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদি কর্মকাণ্ডকেই মনে করিয়ে দেয়। আমরা এ ন্যাক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানাই।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি সুলতান মাহমুদ বলেন, আমি এসব ব্যাপারে কিছুই জানি না। শুধু শুধু আমার ব্যাপারে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
এ ঘটনায় রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহাফুজুর রহমান হুমায়ুন বলেন, যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আমাদের দলের কেউ না। দলের দুর্নাম করার জন্যই আওয়ামী পেতাত্তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
তিনি বলেন, ফল উৎসব যাতে এনসিপির নেতারা সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে পারে অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি মাঠের পাশে এক কোনে অবস্থান নিয়ে ছিলাম।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সিনিয়র সরকারি পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, এনসিপির ফল উৎসবের প্রোগ্রামে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ প্রশাসন নিয়োজিত রয়েছে। তারা নির্বিঘ্নে তাদের ফল উৎসবের প্রোগ্রাম করতে পারবেন।
এদিকে এ ঘটনার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিহার করুন, কাজ না থাকলে সীমান্ত পাহাড়া দেন, তাহলেও একটা কাজ হবে।
তিনি বলেন, আজকে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীরা খোলস পাল্টে ছাত্রদল ও যুবদল বনে গিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে।
দুই দফা বাধা, হামলা, ভাংচুর ও আহত ঘটনার পরেও শনিবার (৬ জুন) বিকাল পাঁচটার দিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক ফল উৎসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আজকে যে প্রোগ্রামটা ছিল, এটা ছিল বাঙালি সংস্কৃতির একটা অংশ। এটা হলো বাঙালির ফলের মাস। কেউ আম খায়, জাম খায়, কাঁঠাল খায়। আমরা এলাকাবাসীকে নিয়ে একটু ফল খাবো, যাতে এটা মিডিয়ার মাধ্যমে দেখানো হবে, বাংলাদেশের মানুষ জানবে। আমরা যাতে ভবিষ্যতেও ফল বিদেশে রপ্তানি করে স্বনির্ভর একটা বাংলাদেশ বানাতে পারি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানতে চেয়ে বলেন, এ ফল উৎসবে হামলাটা আজকে কেন হলো? এই যে দেখেন রক্তাক্ত করা হলো। তো এটা হলো কাপুরুষোচিত আচরণ। রাস্তায় আসার পথে দেখলাম একটা ছেলে ইট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাটকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তোমাকে এগুলা কে বলেছে? একটু আগে নাকি রামদা নিয়ে আসছে। এইগুলা তো আসলে রাজনীতি না। বিগত সময় আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ, যুবলীগ যে সব কর্মকাণ্ড করতো ছাত্রদল এখন সে কাজ করছে। আমি বিএনপিকে বলবো এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের রাজনীতি না করে সীমান্ত পাহাড়া দেন। অন্তত দেশের একটা কাজ হবে।
এনসিপির এ নেতা আরও বলেন, আমাকে অনেকে বলেছে, রুপগঞ্জের অনুষ্ঠানে আপনি যাবেন না। আপনার জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি তাদের বলেছি, আমার সহকর্মীকে মারধর করা হবে আর আমি যাবো না, তা হবে না।