• শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন
  • Bangla Converter
সংবাদ শিরোনাম

আবারও বিক্ষোভে উত্তাল ভারত

আলোকিত নারায়ণগঞ্জ ডেস্ক / ২৪ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতে ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ করছেন বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে নির্বাচনে সুবিধা করে দিতেই পরিকল্পিতভাবে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। এ পরিস্থিতিতে কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিও জোরালো হয়েছে।

বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) শনিবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সিজেপির দাবি, বিক্ষোভের কয়েকজন নেতাকে আগেই আটক করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে বিজেপি জানিয়েছে, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। বাদ পড়াদের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র চলে গেছেন, ১ কোটি ভোটারের নাম একাধিকবার তালিকাভুক্ত ছিল এবং প্রায় ৩ কোটি ভোটারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাদের দাবি, ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম—এমন ভোটারদের নাম পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য ভোটার নিবন্ধন, তালিকা সংশোধন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

প্রায় ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে এসব বিষয়ে আপত্তি জানানো হলেও তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী নেতারা কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন, বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন।

তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। কমিশনের সব সিদ্ধান্ত আইন মেনেই নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগও নাকচ করেছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে বিজেপির অভিযোগ, বিরোধীরা বৈধ নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

রাজ্য নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এমন এক সময়ে তীব্র হয়েছে, যখন আগামী বছরের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আগামী বছর অন্তত সাতটি রাজ্যে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশ, যা ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৫ সালের অক্টোবরে উত্তর প্রদেশে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের কাজ শুরু হওয়ার পর প্রায় ১৩ শতাংশ নাম বাদ পড়েছে। তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হতে নিজেদের পরিচয় ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ তুলেছেন অনেক ভোটার।

বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনা ইতোমধ্যে কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনি ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।

তাদের আশঙ্কা, নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং আপিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ভবিষ্যতের নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই পদ্ধতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে বিরোধীরা।

তবে বিজেপির বক্তব্য, নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নির্বাচনে দলটির সাফল্যের প্রধান কারণ।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে কী হবে?

ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভোটারের মৃত্যু হলে, একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার তালিকাভুক্ত থাকলে, তিনি অন্য এলাকায় স্থায়ীভাবে চলে গেলে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া না গেলে ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নাম বাদ দেওয়ার কারণ নথিভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে কর্মকর্তাদের।

খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের সুযোগও রয়েছে। এমনকি চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে বাদ পড়া ভোটারদের ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ভোট দিতে হলে আপিলে সফল হতে হবে অথবা নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে নিবন্ধনের আবেদন করতে হবে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় অনেক ভোটারের পক্ষে নিজেদের নাম পুনরায় তালিকাভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

মোদির শাসনামলে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রায় ১২ বছরের শাসনামলে ভোটার তালিকা যাচাই নিয়ে চলমান বিতর্ক অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আগামী বছরের রাজ্য নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলছে।

গত বছর এক বিরল সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী দলগুলোকে তাদের অভিযোগ হলফনামার মাধ্যমে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তাতেও বিতর্কের অবসান হয়নি।

এরই মধ্যে তরুণদের নেতৃত্বাধীন সিজেপি নতুন করে আন্দোলনে নেমেছে। গত জুলাইয়ে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের মুখে দেশটির শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার দাবি করেছিল দলটি। এবার ভোটার তালিকা ইস্যুতে তাদের আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নজর রয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে এই বিতর্ক নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, ভোটাধিকার এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামী নির্বাচনগুলোতে এর রাজনৈতিক প্রভাব কতটা পড়বে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সূত্র: রয়টার্স ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..